অমুক ছেলেটার/মেয়েটার বাবা অথবা মা সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা। তাদের অনেক সুযোগ সুবিধা। সে বাপের পাওয়ারে চলে। বাপের পাওয়ারে অনুষ্ঠানে গান গায়, সুইমিং পুলে সাঁতার কাটে, বিভিন্ন বড় প্রোগ্রামে যায়, একা বিদেশ ঘোরার সুযোগ পায়, নতুন নতুন জায়গায় যায় হ্যান ত্যান। নিজের কোনো যোগ্যতা নাই। বাপের যোগ্যতায় চলে। বাপ যেদিন মারা যাবে সে রাস্তার ফকির হবে। দুইদিন ভাব দেখায় চলে লাভ নাই। যেদিন বাপ যাবে, সেদিন তার সব যাবে।

এগুলো তো বাইরের কথা। এবার একটু ভেতরে যাই।আমার নিজের জীবনটাই তুলে ধরি।

আমার যেদিন জন্ম হয়, সেদিন আমার মা দেশে,  বাবা কুয়েতে। মেয়ের জন্মের খবর শুনে কত মাইল দূরে বসে আমার বাবাটা চোখের পানি ফেলেছে। তার প্রথম সন্তান জন্মের সময় তার স্ত্রীর পাশে থাকতে পারে নাই। সন্তান জন্মের পর কাছে যেয়ে আজান দিতে পারেনাই। আমার বাবা আমাকে প্রথম দেখেছে যখন আমার বয়স দুই মাস। আমার বাবার এই গোপন চোখের পানি কেউ জানেনা।

কয়েক বছর পর পর অন্য জায়গায়, অন্য স্কুলে চলে যাওয়ার সময় পরিচিত জায়গা ছেড়ে চলে যাওয়ার কষ্ট কেউ জানেনা। নতুন স্কুলে, নতুন পরিবেশে সংগ্রাম করে টিকে থাকার কথা কেউ জানেনা।

২০১০ সালে আইভোরি কোস্টে যুদ্ধের সময় আব্বু জাতিসংঘের হয়ে যুদ্ধবিধস্ত মানুষদের সেবা করতে আমাদের ছেড়ে চলে যায়। যুদ্ধবিধস্ত একটা দেশে বাবা খেয়ে না খেয়ে জংগলে ক্যাম্পে কাটাতো। মাঝে মাঝে শুকনা খাবার জুটত তাও। আমার বাবার এই বেঁচে থাকার সংগ্রামের কথা কেউ জানেনা। বাবা যখন আইভোরি কোস্টে একা, তখন প্রতিদিন প্রতিটা মূহু্তে প্রতিটা কাজে বাবার অভাব অনুভব করতাম। রাতে বিছানায় একা শুয়ে শুয়ে চোখের পানি ফেলতাম। আমার চোখের পানি কেউ দেখেনাই।

এক সময় বাবা আমাকে অনেক সময় দিতো। এখন তার কাজে প্রচন্ড ব্যস্ত থাকে। আমার জীবনের অনেক কিছুই কারো সাহায্য ছাড়া করতে হয়। আমার একাকীত্ব কেউ দেখেনা।

তোমরা যারা মুদ্রার এপিঠ দেখে ওপিঠ না দেখে অন্যদের জাজ করো, তারা অনেক বড় ভুল করো। আমার হয়তো কোনো গুণ নাই, কিন্তু কলমের কালি ঠিকই আছে। আর আছে একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক পরিশ্রমী নির্ভেজাল মানুষকে খুব কাছে থেকে দেখার অভিজ্ঞতা। এটাই আমার গৌরব। কয়জনের এমন বাবা থাকে?

জানুয়ারি ৩০, ২০১৬

Advertisements