তুমি নিশ্চয়ই সমুদ্র দেখেছ? আচ্ছা, সমুদ্রের পাড়ে এত বিশাল বালুময় সৈকত দেখে তোমার মনে প্রশ্ন জাগেনি, এটি কীভাবে তৈরি হল? এত বালু কোথা থেকে এল? কিংবা ধরো, পাহাড়ের গা ঘেঁষে পড়ে থাকা ছোট্ট একটি পাথরের কথা।

পাথরটার গা এবড়ো থেবড়ো। একদিন বৃষ্টি এসে ছোট্ট পাথরটিকে ধুয়ে নিয়ে গেল এক ছোট নদীর দিকে। ছোট নদী, ছোট পাথরটিকে ঠেলে দিল বড় নদীর দিকে। তখন বড় নদীই হল ছোট্ট পাথরের ঠিকানা। নদীর তলদেশে পাথরটি ক্রমাগত ঘুরপাক খেতে লাগল। ঘুরপাক খেতে খেতে পাথরটি ভেঙ্গে ভেঙ্গে কয়েকটি চমৎকার মসৃণ নুড়িতে পরিণত হল। এখন সেই ছোট্ট নুড়ি স্রোতের টানে ক্রমাগত ছোট হতে হতে একটি ক্ষুদ্র বালুকণায় পরিণত হল। অন্য অসংখ্য ছোট বালুকণাদের সঙ্গে মিলে গিয়ে তৈরি করলো একটি বিশাল বালুর সমুদ্র। বিষয়টি মজার না?

তোমার কি জানতে ইচ্ছে করে না, এই বিশাল পৃথিবী কীভাবে তৈরি হল? কীভাবে এত প্রাণের বিকাশ ঘটল? কীভাবে মানুষ এল? মানুষ কীভাবে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করা শিখল? কীভাবে এত সব অসামান্য আবিষ্কার করল?

এই সব প্রশ্নের পিছনে আছে সেই সমুদ্র সৈকতের মতো অনেক চমকপ্রদ ঘটনা আর এগুলো জানতে তুমি পড়তে পার ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রি জওহরলাল নেহেরুর লেখা ‘বাবার চিঠি’ বইটি। বইটিতে পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশ থেকে শুরু করে, রামায়ণ, মহাভারত পর্যন্ত সবকিছু দেওয়া আছে। তুমি যখন বইটি পড়বে, তখন মনে হবে যেন সেই আদিমযুগের পৃথিবী ঘুরে আস্তে আস্তে সভ্যজগতে পা ফেলছ! কীভাবে জনশূণ্য পৃথিবী অসংখ্য প্রাণীতে ভরে গেল, আস্তে আস্তে প্রাণের বিকাশ ঘটতে ঘটতে কীভাবে মানুষ এল, কীভাবে তারা আগুনের ব্যবহার শিখল, চাষাবাদ শুরু করল, যোগাযোগের জন্যে ভাষা তৈরি হল, সভ্যতা, ধর্ম– সব নিয়েই চমৎকারভাবে গল্পগুলো বলা হয়েছে।

আমি যখন বইটি পড়েছি তখন মনে হচ্ছিল আমার চোখের সামনে দিয়ে যেন ফসিলগুলো জ্যান্ত হয়ে গেছে। প্রাচীন পৃথিবীর রহস্যময় প্রাণীগুলো আমার পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। বিশাল ডাইনোসর আমার বাসার সামনের মাঠে গাছ থেকে লতাপাতা খাচ্ছে। আর প্রাচীন মানুষ সেই গাছ থেকে লাফ দিয়ে নেমে আগুন ধরানোর চেষ্টা করছে। ধীরে ধীরে শিকার করা বাদ রেখে কৃষিকাজ করা শুরু করেছে। আমি যেন সেই প্রাচীন জনপদ মেসোপটেমিয়া, ব্যাবিলন, মিসর থেকে শুরু করে ফারাওদের সাম্রাজ্যে চলে এসেছি! ইতিহাসের বিবর্তন আমার কল্পনায় স্পষ্টভাবে দেখতে পাচ্ছি, অনুভব করতে পারছি!

এই বইয়ের সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল, এই গল্পগুলো প্রথমে চিঠি হিসেবে লেখা হয়েছিল। জওহরলাল নেহেরু ১৯২৮ সালের দিকে তাঁর মেয়ে ইন্দিরা গান্ধীকে চিঠিগুলো লিখেছিলেন। তখন ইন্দিরার বয়স আট কি দশ। গ্রীষ্মের সময় ইন্দিরা ছিলেন মুসৈরির হিমালয় পাহাড়ের উপরে। আর তাঁর বাবা ছিলেন পাহাড়ের নিচে। ইন্দিরার পৃথিবী ও চারপাশের জগৎ নিয়ে প্রবল কৌতূহল ছিল। তিনি বাবাকে একের পর এক প্রশ্ন করে যেতেন তার সব কৌতূহল মেটানোর জন্য। নেহেরুও ছিলেন সবকিছুতে অনেক উৎসাহী। ধৈর্য্য ধরে উৎসাহ নিয়ে ইন্দিরার সব প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যেতেন।

কিন্তু তখন তো ইন্দিরা পাহাড়ের উপর আর তিনি সমতলে,  কীভাবে তিনি তাঁর মেয়েকে গল্প শোনাবেন? তাই বসে না থেকে কলম নিয়ে তিনি শুরু করলেন চিঠি লেখা। একটা সময়ে সেই চিঠিগুলোই  নেহেরুর বন্ধুরা তাঁকে বলেন অন্য সব পাঠকদের মধ্যে তুলে ধরতে। তাই এই ইংরেজি চিঠিগুলো একসঙ্গে করে ‘Letters From A Father to His Daughter’ নামে বই আকারে প্রকাশিত হয়।

বইটি বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। বাংলা ভাষায়ও বইটি অনুবাদ করা হয়। এটি আজিজ সুপার মার্কেট অথবা কোনো লাইব্রেরিতে খোঁজ করলেই পেয়ে যাবে। তাহলে আর দেরী কেন? পড়ে ফেল, মেয়ের কাছে লেখা বাবার চিঠিটি আর ডুবে যাও পৃথিবীর শত রহস্যের মাঝে!

৮ আগস্ট ২০১৪ তারিখে Kidz.bdnews24.com এ প্রকাশিত।

Advertisements