দ্বীপাভিযান: সেন্ট মার্টিনস ১

১.
বাস কুমিল্লায় যাত্রা বিরতির জন্য থামার পরপরই আমি গো ধরলাম, ঢাকা যাওয়ার সময় বাসে যাবোনা- এখনই প্লেনের টিকিট কাটো। আমাদের ভ্রমণকারী দলের বাকি তিনজন সদস্য আমার দিকে অবাক হয়ে তাকালো। বাকি তিনজন বলতে আমার আম্মু, আব্বু আর ছোটবোন মৌনতা। মৌনতা বললো, ‘আব্বু ওর ভাব দেখে মনে হচ্ছিলো দুনিয়ার সব চাইতে ভয়ংকর রোলার কোস্টারে উঠেছে।’ আমি বললাম,’এটা তো রোলার কোস্টার ছাড়ায় গেসে।’ সবাই আমাকে নিয়ে এবারে হাসাহাসি শুরু করে দিলো। আমি মুখ গোমড়া করে বসে থাকলাম, আব্বু বললো,’বাথরুমে যাও, বাসের মধ্যে কিছু হইলে ট্যাক্সি পাবোনা!’ সবাই রেস্টুরেন্ট কাপিয়ে হেসে দিলো, আমার গোমড়া মুখ আরো গোমড়া হয়ে গেলো।’সব পাকিস্তানিদের দোষ’ বলে আমি উঠে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়ালাম। বছর খানেক আগে আমরা মালয়েশিয়া ঘুরতে গিয়েছিলাম। শেষের দিন কুয়ালালামপুরের টাইম স্কয়ার ঘোরার কথা। তার আগে শহরের এক পাকিস্তানি রেস্টুরেন্ট এ রাতের খাবার সারতে গেলাম। সেই খাবার খেয়ে আমার পেটের ভেতর গ্রিন হাউজ ইফেক্ট শুরু হয়ে গেলো। একটা ট্যাক্সিতে উঠে সেদিনের ঘোরাঘুরি বরবাদ করে মনে মনে সারা রাস্তা পাকিস্তানিদের বকতে বকতে হোটেলে ফিরে এলাম। এই হলো কাহিনী।
এদিকে গত বছর দিনাজপুরে একটা গাড়িতে ঘোরার সময় হঠাৎ গাড়ির ব্রেক ফেইল করলো। একটার পর একটা গাড়ি পাশ কাটিয়ে আমরা যে কীভাবে বেঁচে গেলাম! তার মধ্যে আমি ছিলাম সামনের সিটে। সেই দিন থেকে সড়ক পথে ভ্রমণ আমার জন্য ভীতিপ্রদ হয়ে দাঁড়ালো, রিকশায় উঠলে তো কথাই নেই, তবুও প্রয়োজনে রিকশায় উঠতে হয়। প্লেনে উঠলে অন্তত ককপিট দেখা লাগেনা, চারপাশে শুধু মেঘ। তাই আমি আতংকে অস্থির হয়ে এমন অস্বাভাবিক ইচ্ছা প্রকাশ করলাম। একটুক্ষণের জন্য মনে হলো পড়ালেখা করে নিজের পায়ে দাঁড়ানো উচিত, যাতে অন্তত বাসে উঠে ভয়ে কাঠ হয়ে থাকতে না হয়।
যাত্রাবিরতির পর গাড়ি ছেড়ে দিলে আমি হাত পা শক্ত করে বসে থাকলাম। মৌনতা বললো, ‘এত ভয় পাওয়ার কিছু নাই। চোখ বন্ধ করে মনে করো প্লেন ল্যান্ড করছে।’ আমি তাই করলাম। আরো ৪ ঘন্টা প্লেন ল্যান্ড করতে করতে কক্সবাজারের কাছাকাছি চলে আসলাম। অনেকদিন পর সকাল হওয়া দেখালাম। আস্তে আস্তে একদম অন্ধকার থেকে আলো হয়ে যাচ্ছে চারপাশ। আকাশের প্রতিবিম্ব হাইওয়ের পাশের গ্রাম্য পরিবেশের পুকুর গুলোয় অসাধারণ লাগছে। এখন নিশ্চয় ধান কাটার মৌসুম, কিছুক্ষণ পরপর আবছা আলোয় অর্ধেক কাটা সোনালী ধানক্ষেত দেখা যাচ্ছিলো।
রেস্টহাউজে উঠে সবাই ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। আমি একা একা সমুদ্রের পাড়ে হাটতে বেড়ুলাম। স্পঞ্জ স্যান্ডেল পড়ে দীর্ঘ বালুময় পথ পাড়ি দিয়ে সমুদ্রের কাছাকাছি চলে গেলাম। অনেক কম মানূষজন। যারা আছে তারা কোনো একটা দল নিয়ে আছে। আমিই শুধু একা। ভেজা বালুর মধ্যে পা রাখতেই সাদা ফেনাওয়ালা ঢেউ আমার পায়ে আছড়ে পড়লো। আমার পায়ের নিচ থেকে বালু সরে যাচ্ছিলো, মনে হচ্ছিলো যেন বালু গুলো আমাকে জোর করে সমুদ্রের আরো কাছে নিয়ে যেতে চাচ্ছে। লোনা বাতাস আমার মুখে ঝাপটা মেরে গেল। আমি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে পেছনে ফিরে গেলাম, কিছুদূর যেয়ে সমুদ্রের তীরে প্রথম একদম একা হাটার স্মৃতিস্বরূপ কিছু নকশা করা শামুক আর খাঁজকাটা ঝিনুক তুলে নিলাম। হঠাৎ আজানা কারনে আমার মনটা বিষাদগ্রস্ত হয়ে গেল। আমি সেই বিষাদময়তা নিয়ে সমুদ্রের দিকে একবার ফিরে তাকিয়ে বুঝলাম, সমুদ্র আসলেই আমার খুব প্রিয়। আমি আবার সেই দীর্ঘ বালুময় পথ দিয়ে হাটা শুরু করলাম।
দুপুরে আমরা সবাই মিলে আবার সমুদ্রে আসলাম। আম্মু আর মৌনতা লোনা পানিতে ভিজতে থাকল, আমি আর আব্বু ক্যামেরা নিয়ে এটা সেটার ছবি তুলতে থাকলাম। আমি ফটোগ্রাফির কিছুই বুঝিনা, শুধু ক্যামেরায় ক্লিক করে ছবি তুলতে পারি। তবুও অনেক কিছুর ছবি তুললাম। ঝালমুড়ি ওয়ালা, সার্ফার, ঘোড়া, শামুকের জিনিস বিক্রেতা, বেলুন বিক্রিরত শিশু, লাইফগার্ড – আরো অনেক কিছু।
বিকালে আমি শাড়ি পড়ে গেলাম সমুদ্রের পাড়ে, এবার মৌনতা ক্যামেরাম্যান। বিকালের সমুদ্র খুবই সুন্দর। ঢেঊ গুলো আরো বড়, ফেনাগুলো আরো সাদা, ল্যান্ডস্কেপটা বেশিই জোস। নিজের ছবি মৌনতাকে দিয়ে কয়েকটা তুলিয়ে আবার ছবি তুলতে বসে পড়লাম। বারান্দায় এসে সূর্য ডোবা দেখলাম। মনে হচ্ছিলো সূর্যটা যেন সমুদ্র গহবরে হারিয়ে যাচ্ছে।
সন্ধ্যায় সুগন্ধা বিচ থেকে আনা সামুদ্রিক খাবার- কাকড়া, স্কুইড, লবস্টার রেস্টহাইজের কাছে একটা ছাদহীন ক্যাফেতে বসে সমুদ্রের গর্জন শুনতে শুনতে রাতের খাবার সারলাম। সাথে ছিলেন আব্বুর বন্ধু লিয়াকত আংকেল। তিনি মাত্রই সেইন্ট মার্টিনস থেকে ঘুরে আমাদের সাথে দেখা করতে এসেছেন। তার মতে, ‘সেইন্ট মার্টিনস এ কিচ্ছুই নাই। খালি স্বচ্ছ পানি। যাওয়ার কোনো মানেই হয়না। ভ্যানে বসে ঘুরতে ঘুরতে আমার হাটু ব্যথা হয়ে গেসে।’ আম্মু আর মৌনতা আমার দিকে চোখ পাকিয়ে তাকালো। আমি তাদের দৃষ্টি সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে খাওয়ার মন দিলাম। মাথার উপরে গাঢ় কালো আকাশে আব্বুর চিনিয়ে দেওয়া কন্সটেলেশন অরিয়ন আর ক্যাসিওপিয়া চিনতে পারলাম। তারাভরা আকাশ আর সাদা সমুদ্রের ফেনা দেখতে দেখতে রাতের ভোজ সম্পন্ন করলাম।
ডিসেম্বর ১, ২০১৬

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s