২০১৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর কিশোর আলোর সুবাদে বিশাল কিআ বাহিনীর সাথে মুহাম্মদ জাফর ইকবাল স্যারের বাসায় তাঁর জন্মদিনে হানা দেওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। সেদিনের অভিজ্ঞতা একটা ডায়েরিতে লিখে রেখেছিলাম। আজকে পুরাতন জিনিস ঘাটতে গিয়ে ডায়েরিটা খুঁজে পেলাম-

আমার প্রিয় লেখকদের মধ্যে একজন মুহাম্মদ জাফর ইকবাল স্যার। তাঁর সাথে দেখা হওয়ার ঘটনা আমি জীবনেও ভুলতে পারবোনা। আমার ভাগ্য যা খারাপ, যতবারই বইমেলায় গিয়েছি, কখনও উনার সাথে দেখা হয়নি।
একবার এক বন্ধুর কাছে শুনলাম তাঁর বাসা নাকি আমাদের বাসার কাছাকাছি। শুনে তো আমার মাথা খারাপ হওয়ার মতো অবস্থা হলো! বন্ধূটা বললো, আমরা যেই এলাকায় থাকি তার কিছুদূরে একটা এলাকায় তিনি থাকেন। এমন কথা শোনার পর কি বসে থাকা যায়? আমরা ৩ বন্ধু হয়ে গেলাম তিন গোয়েন্দা- মিশন মুজাইয়ের বাসা খোঁজা। তিনি বিখ্যাত মানুষ, ঠিকানা বের করা অসাধ্য ব্যাপার। তবুও আমরা ঠিক করলাম খুঁজে বের করবোই। কিন্তু খুঁজতে গিয়ে পড়লাম বিপাকে। বাসায় বাসায় বেল দিয়ে তো বলা যায়না, ‘এটা কি মুহাম্মদ জাফর ইকবালের বাসা?’ তাই হাল ছেড়ে বাসায় চলে আসলাম।
ওইমাসে ২১ তারিখ ছিলো কিআর মিটিং। সেখানে গিয়ে দেখি স্যারের কার্টুন আঁকা একটা ব্যানারে সবাই জাফর ইকবাল স্যারকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা লিখে জানাচ্ছে। আমিও লিখলাম। বলা হলো, ২৩ তারিখ স্যারের জন্মদিনে এই ব্যানার নিয়ে উনার বাসায় যাওয়া হবে। আমি আরেকটু হলে কেঁদেই দিতাম।
যথাসময়ে আমরা বিরাট কিআ বাহিনী তাঁর বাসার সামনের রেল লাইনের পাশে অপেক্ষা করতে থাকলাম। সবার সাথে কথা বলতে বলতে দেখলাম, রেললাইনের উল্টোপাশের রাস্তা থেকে সাধারণ পোশাক পড়া একজন মানুষ আসছেন যার মুখ ঢাকা। কে সেটা বুঝতে আমাদের সময় লাগলোনা। তিনি আমাদের কাছে এসে তাঁর মুখের কাপড় খুলে ফেললেন। আমি তুষারশুভ্র গোঁফ-চুল আর চশমা পড়া একজন ক্রিয়েটিভ মানুষকে দেখতে পেলাম, যার ছবি এতদিন পত্রিকা আর তাঁর বইয়ের শেষের পৃষ্ঠায় দেখেছি। যাঁর লেখা বই একবার পড়তে বসলে কোনোভাবেই আমি উঠতে পারিনা!
স্যারকে আমরা হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো অনুসরণ করে তাঁর বাসায় ড্রইংরুমে যেয়ে বসলাম। দেয়াল অনেক সুন্দর পেইন্টিং আর কাঠের মুখোশ দিয়ে সাজানো, পাশে একটা বারান্দা। একশো জনের মতো কিশোর-কিশোরীতে ঘর ভরে গেল।
স্যারের জন্য আমি একটা কার্ড বানিয়েছি, তাঁর লেখা আমার প্রিয় বই ‘ব্ল্যাকহোলের বাচ্চা’র প্রচ্ছদ নকল করে। সবাই তাঁর জন্য কিছু না কিছু এনেছে। তিনি সবাইকে ক্ষুদে ভক্তদের আনা উপহার দেখালেন আর ধন্যবাদ জানালেন। আমার দেওয়া কার্ডটাও সবাইকে দেখিয়ে  তাঁর কম্পিউটার টেবিলে রাখলেন। স্যার বললেন, ‘তোমাদের অনেকক্ষণ রেললাইনের পাশে অপেক্ষা করতে হয়েছে এজন্যে অনেক সরি!’ বলে তাঁর পরিবারের সদস্যদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন, যদিও সবাইকে আগে থেকেই চিনি।
স্যার এক এক করে আমাদের সবার পরিচয় জানতে চাইলেন। প্রত্যেকে তাদের নাম, স্কুল, ক্লাস জানাতে থাকলো। এমন সময় আনিসুল হক স্যার আর সিমু নাসের ভাইয়া বিশাল কেক নিয়ে উপস্থিত হলেন। কিআর মিটিং এ আমাদের শুভেচ্ছা লেখা ব্যানার স্যারকে দেওয়া হল। তিনি অসম্ভব খুশি হলেন।
কেক কাটা শেষে তিনি বললেন, ‘এরকম জন্মদিন আগে কখনো হয়নি।’ আমরা আনন্দে চিৎকার করে দিলাম।
সবাই স্যারের সাথে ছবি তুললো, অটোগ্রাফ নিলো। তাঁর জন্মদিনের কেক, মিষ্টি, সিংগারা খেলাম।  এতজনকে অটোগ্রাফ দিতে হবে, তবুও স্যার বিরক্ত হলেন না। আমি উনার জায়গায় থাকলে মনে হয় সবাইকে ঘাড় ধরে বাসা থেকে বের করে দিতাম!
তাঁকে বিদায় জানিয়ে বাসা থেকে বের হলাম। আমার সাথে আমার সেই বন্ধু ছিলো। সে বললো, ‘ওই! আমি উনার বাসার লাড্ডু টিস্যুতে করে আনসি। তোর ব্যাগে ঢুকাইসি।’ দুইজন মিলে আমাদের বাসায় ঢুকে আমার বোন মৌনতা আর পুস্পিতাকে লাড্ডু দেখিয়ে বললাম, ‘জাফর স্যারের বাসার লাড্ডু।’ কথা শেষ করতে না করতেই দুইজন লাড্ডুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো! কিন্তু আমি আর আমার বন্ধু খুব চালবাজি করে ওদের লাড্ডু কম দিয়ে আমরা বেশি খেলাম। প্রিয় লেখকের বাসার লাড্ডু, কম কথা না। 😂 লাড্ডু খেতে খেতে মনে পড়লো, তিনি আমাদের এত্ত অসাধারণ সুন্দর একটা শৈশব উপহার দিয়েছেন সেজন্যে তাঁকে ধন্যবাদ জানানোর কথা ভুলে গিয়েছি!
২৩ ডিসেম্বর, ২০১৩

Advertisements