সবাই বলে যারা স্বাধীনভাবে নিজের জীবন পরিচালনা  করে তারাই সত্যিকার অর্থে জীবনটাকে উপভোগ করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্বাধীনতাটার অর্থ বাবা মা’র প্রভাব থেকে বের হয়ে আসাকে বোঝায়। কিন্তু সত্যি কী তাই? যখন বাবা মা’র কোলে ছিলাম তখন কী স্বাধীন ছিলাম না?

কোনো সমস্যা হলে নিজের সমাধান করতে হতোনা। মা বাবা ছুটে এসে সব ধরণের বিপদ থেকে রক্ষা করতো। আমি কিন্তু এখন কিছুটা বড়। সেদিন একটা ঝামেলায় পড়লাম। কিছুটা আব্বুকে খুলে বলার পর বললো, ‘তুমি নিজের সমস্যা নিজে সমাধান করো।’ আমি কিছুক্ষণ চিন্তা ভাবনা করে একটা সমাধান বের করলাম। যদিও সেই সমাধানটার কারণে আমার কিছুক্ষণ মন খারাপ ছিলো। কিন্তু আমি উঠে বসে সব ভুলে গিয়ে আবার নিজের অন্য কাজে মন দিলাম। এটাকেই হয়তো ‘পরিপক্বতা’ বলে!

আমার বাবার বদলির চাকরি। ছোটবেলা থেকেই দেশের বিভিন্ন জায়গায় থাকার সুযোগ হয়েছে। তখন যখন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতাম তখন কিছুই বুঝতাম না। তেমন মন খারাপ হতোনা।

কয়েকদিন আগে ধানমন্ডি এলাকা থেকে ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় বদলি হয়ে এলাম। প্রথম যেদিন বাসায় উঠলাম সেদিন প্রচুর মন খারাপ লাগছিলো। ধানমন্ডির বাসাটার জন্য মন খারাপ লাগছিলো। বারবার মনে হচ্ছিলো, আমার কি তাহলে কোথাও স্থায়ী ঠিকানা নেই? আমি শিকড় বিহীন?

কিন্তু পর দিন নতুন এলাকাটা ঘুরে দেখলাম। প্রথমে নতুন জায়গায় অস্বস্তিকর লাগলেও পরের কিছুদিনের মধ্যেই খাপ খাইয়ে ফেললাম। ভালোও লাগলো জায়গাটা। কিন্তু আবার কয়েক বছর পর এই জায়গা ছেড়ে নতুন জায়গায় যাওয়ার সময় পুরাতন ঠিকানার জন্য খারাপ লাগবে। আবার সেই নতুন ঠিকানা যেই মূহুর্তে পুরনো হয়ে যাবে সেদিন নতুন করে খারাপ লাগবে। ছোটবেলায় কিন্তু এই হোমসিকনেসটার কষ্ট থেকে মুক্ত ছিলাম।

তখন আমার বয়স ৫ কিংবা ৬। আব্বুর রাজশাহীতে পোস্টিং অর্ডার বের হয়েছে। বাসায় তখন গোছগাছের ঝামেলা। আমার তখন এই গোছগাছের ঝামেলা থেকে মুক্তি ছিলো। প্রতিদিন নতুন বাসার সামনের বিশাল সবুজ মাঠে আব্বুর সাথে ফ্রিজবি খেলতাম। ফ্রিজবিটা আব্বু ছুড়ে মারতো, তখন আমার সমস্ত মনযোগ সেই উড়ন্ত ফ্রিজবির উপর নিবদ্ধ। দুনিয়ার সব কিছু ভুলে লাফ দিয়ে ফ্রিজবি ধরে বাবার কাছে ছুড়ে মারতাম। আমি তখন বেশ আনন্দ নিয়ে ফ্রিজবি খেলতাম, অন্য কোনো চিন্তা মাথায় আসতোনা। কিন্তু আব্বু যখন ফ্রিজবি আমার কাছে ছুড়ে মারতো, তখনো হয়তো আব্বুর মাথায় অন্য চিন্তা খেলা করতো। আমি যেভাবে ফ্রিজবি খেলা উপভোগ করতাম আব্বু সেভাবে করতো না।

সত্যি কথা বলতে আমরা সারাজীবনই স্বাধীন থাকি। কিন্তু সেই স্বাধীনতার ধরণটা কালক্রমে পরিবর্তিত হয়।

সেদিন আমার ক্লাস ফোরের ডায়েরি খুঁজে পেলাম। তখন প্রায় প্রতিদিন স্কুলে কী হচ্ছে না হচ্ছে তা ডায়েরীতে লিখে রাখতাম। ডায়েরির পাতা উল্টাতে উল্টাতে মনে হলো, তখনকার চিন্তাভাবনা খুব সরল ছিলো, এখনকার মত এত জটিল না!

১৭ জানুয়ারি, ২০১৭

Advertisements