প্রাচীন শহরে একদিন…

১।
আব্বু বললো, ‘তোমার ইফতেখার আংকেলের সাথে কথা হয়েছে। উনি ব্যবস্থা করে দিবেন।’ আমি হঠাৎ আনন্দে আত্মহারা হয়ে বললাম, ‘সত্যিইই?!’ বলতে বলতে তাল হারিয়ে পড়ে গিয়ে পায়ে ব্যাথা পেলাম।
ঘটনা হচ্ছে আমরা ৩ বন্ধু মিলে পুরান ঢাকায় যাবো। প্রধান আকর্ষণ পুরাতন কারাগার। আব্বু এইমাত্র দেশের সব জেলখানার আইজি সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন আংকেলের সাথে কথা বললো যাতে আমরা ঢুকে দেখতে পারি। আমি যখন ছোট ছিলাম, আমরা যখন রাজশাহী ক্যান্টনমেন্ট এ থাকতাম, ইফতেখার আংকেল আমাদের বাসার কাছেই থাকতেন। আমাদের দুই বোনকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন, প্রায়ই চকলেট চিপ্স পাঠাতেন।
আমি, সুমাইয়া, সবুজ তারিন আর সাবা এই ৫ জন গত দেড় বছর ধরে প্ল্যান করছি পুরান ঢাকায় ঘুরতে যাব। কতবার যে প্ল্যান হয়েছে বলার মতো না! কিন্তু  শেষ পর্যন্ত কারো কোচিং, কারো ক্লাস, কারো পরীক্ষা এগুলার কারণে কতবার যে প্ল্যান ক্যান্সেল হয়েছে! আমি এবার সবাইকে বলেছি, তোরা কেউ না গেলে আমি একাই যাবো। তারপর শেষ পর্যন্ত সুমাইয়া আর সবুজ সময় বের করতে পারলো!
আগের দিন আমাদের সূর্যমামার (তিনি আমাদের খালু  তাও কেন মামা ডাকি নিজেরাও জানিনা!) বাসায় পুরান ঢাকা নিয়ে পরামর্শ নিতে গেলাম। সূর্যমামা প্রচুর ঘুরাঘুরি করে, তাই কী কী দেখবো জিজ্ঞেস করার সাথে সাথেই মুখস্তের মতো বলতে থাকলো, রয়েল এ অনেক মজার খাবার আছে, কেল্লাফতের বার্গার কিন্তু সেইই, ভূতের বাড়ি রেস্টুরেন্টটা খুবই ইন্টারেস্টিং, নীরব হোটেলের ব্রেকফাস্ট বেস্ট, বিউটি লাচ্ছি না খেলে জীবন বৃথা! আহসান মঞ্জিল আর লালবাগের কেল্লা অবশ্যই দেখতে যাবে, আর সদরঘাটে নৌকায় উঠতে যেওনা, বুড়িগঙ্গার পানি খুবই ময়লা…..
কোথাও ঘুরতে গেলে আমার সাধারণত আগের রাতে উত্তেজনায় ঘুমই হয়না। আজকে তো আরো হলো না। পুরা চিন্তাভাবনার কেন্দ্রবিন্দু- আমি অপরাধী কয়েদিদের সামনাসামনি দেখবো। ভয়ংকরতম জঘণ্যতম অপরাধী, কেউ খুনি, কেউ ধর্ষক! যতই কালকের কথা কল্পনা করতে থাকলাম ততই ঘুম চলে যেতে থাকলো। অবশ্য পরে যেয়ে শুনলাম এখন কয়েদিরা থাকেনা সেখানে।

২।
রাতে ঘুম তো হলোইনা, সকালে উল্টো প্রচুর ঘুম আসতে থাকলো। আমি ঘুম কাটানোর জন্য ফাস্ট বিটের গান শুনতে শুনতে বাইরে হাটতে বের হলাম। যেয়েই দেখলাম সারা রাস্তা পানিতে ভেজা, অর্থাৎ বৃষ্টি হয়েছিলো সারারাত। ভালোই হলো, সারারাত বৃষ্টি হলে সারাদিন নিশ্চয়ই হবেনা!
বাসায় এসে দেখি আব্বু বারান্দায় বসে চিন্তিত মুখে চা খাচ্ছে। আমাকে বললো, ‘ওয়েদার ফোরকাস্ট টা দেখেছো? আজকে ৩ নম্বর বিপদ সংকেত দিয়েছে, নিম্নচাপও হচ্ছে, ওয়েদার ডিপ্রেশন হচ্ছে। সারাদিন বৃষ্টি পড়ার সম্ভাবনা ৮০ ভাগ। তোমরা গেলে আমার অসুবিধা নাই, কিন্তু একটু চিন্তা করে দেখো আজকেই যাবে কিনা।’ সাথে সাথেই সুমাইয়ার ফোন আসলো। আমি সুমাইয়াকে আবহাওয়ার কথা বললাম, দুইজন মিলে কিছুক্ষণ আবহাওয়াকে গালাগালি করলাম, তারপর আমরা ঠিক করলাম একটু আধটু রিস্ক জীবনে নিতেই হয়।
৩ জন গাড়িতে উঠে ঠিক সকাল ৮.৩০ টায় পুরান ঢাকার পথে রওনা দিলাম। আজকে শুক্রবার, তাই ঢাকা শহর একদমই ফাঁকা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জনহল পেরিয়ে একটা চিপা গলিতে গাড়ি ঢুকে গেলো, রাস্তা অথবা গলিটার নাম নাজিমুদ্দিন রোড। সবুজ আমাদের আগে পুরান ঢাকা অনেকবার ঘুরে এসেছে, ওকে আমাদের ট্যুর গাইড বলা যায়। সবুজ অবিকল একজন ট্যুর গাইডের মতোই বললো, ‘এইতো ঢুকলাম আমরা পুরান ঢাকায়।’ আমি অবাক বিস্ময়ে চারিদিকে তাকালাম। একটার পর একটা পুরাতন দালান, মাঝখানে চিপা গলি, পুরো জায়গাটাতেই প্রাচীন প্রাচীন ভাব আছে। তখনো বুঝিনাই আমাদের জন্য সারাদিন একটার পর একটা আনন্দদায়ক চমক অপেক্ষা করে আছে।

৩।
কারাগারে আমাদের ১১ টায় আসার কথা, আমরা এসেছি ৯.৩০ টার দিকে। তাই সময় নষ্ট না করে চাংখারপুল এলাকায় এদিকওদিক হেঁটে দেখা শুরু করলাম। কারাগারের বাম দিকে সেই নাজিমুদ্দিন রোডের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। পুরো এলাকাটাই চিপা গলি, সবগুলো বিল্ডিং এ প্রাচীনত্ব লক্ষ্য করলাম। একটু পর পর ই বাকরখানির দোকান। আমি আমার সফরসঙ্গীদের বললাম, ‘প্লিজ আমরা একটু বাকরখানি বানানো দেখি। একটু থাম না!’ সবুজ বললো, ‘বাকরখানি বানানো দেখার মধ্যে কী আছে? আমার খুব ক্ষুধা লাগসে, না খেয়ে আসছি।’ সুমাইয়া বললো, ‘দেখতে চাচ্ছে একটু দেখুক না।’ আমরা দাঁড়িয়ে পড়লাম একটা বাকরখানির দোকানের সামনে। ছোট একটা উঁচু পাটাতনের দোকানের মধ্যে ৩ জন কর্মী। মেঝের মাঝখানে একটা বড় গর্ত, যেটায় কয়লার সাহায্যে গোল গোল ময়দার খন্ড কে বাকরখানিতে পরিণত করা হচ্ছে। একজন এই গর্তের গায়ে বাকরখানি গুলো দক্ষ হাতে লাগিয়ে দিচ্ছে আর বাকি দুজন আটাকে বাকরখানির আকার দিচ্ছে। আমি বাকি দুজনের দিকে এবার নজর দিলাম। ময়দার কাইয়ের পাতলা আস্তরণ এর উপর তেল আর ময়দা ছিটিয়ে একটার পর একটা স্তর তৈরি করা হচ্ছে। দুজন কর্মীর দুই পাশে ময়দার সাগর যেন। হাত দিয়ে প্রায় খাবলা দিয়ে ময়দা ছিটিয়ে দিচ্ছে। পুরা ব্যাপারটার শেষ পর্যন্ত যেতে কী পরিমাণ ধৈর্য আর দক্ষতা লাগে ভেবে আমি অত্যন্ত অবাক হলাম। আমি যে বাসায় মাঝে মধ্যে ময়দার কাই দিয়ে ডোনাট বানাই ওটা বাখরখানি বানানোর প্রক্রিয়ার তুলনায় কিছুই না কিন্তু সেটা করতেই আমার জান পানি হয়ে যায়। সুমাইয়া নীরবতা ভেঙে বললো, ‘তোমার নিশ্চয়ই বাকরখানি খেতে ইচ্ছা করছে। আমি খাওয়াচ্ছি।’ আমি আর সুমাইয়া ৫ টাকার ২ টা মিষ্টি আর সবুজ ৩ টাকার ১ টা মিষ্টিছাড়া বাকরখানি নিলো। বাকরখানি গুলা মাত্র তৈরি করা গরম গরম ছিলো। আমি আর সুমাইয়া আমাদের বাকরখানি মুখে দেওয়ার আগেই সবুজ নিজেরটা প্রায় পুরোটা মুখে ঢুকিয়ে বিলাপ করলো, ‘হায় হায় রে! আমার জিহ্বা পুড়লো!’ আমি আর সুমাইয়া ওর অবস্থা দেখে সাবধান হয়ে নিজেদেরটা মুখে দিলাম। অসাধারণ! একদম ফ্লেকি, মুচমুচে! সুমাইয়া বললো, ‘আমি জীবনে এত উৎসাহ নিয়ে কখনোই বাকরখানি খাই নাই! কী মজার!’ আমরা সামনের দিকে অগ্রসর হলাম। একটা পানের দোকান দেখে আমি থমকে দাঁড়ালাম, পুরান ঢাকার আগুন পান অনেক ঐতিহ্যবাহী শুনেছি। একটা ছোট কাচের  ডেস্কের উপারে একজন বৃদ্ধ লোক খুবই মনযোগ দিয়ে পান বানাচ্ছেন। ডেস্ক ভর্তি রূপালি পাত্রে বিভিন্ন মসলা আর তাজা পান। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘মামা আগুন পান হবে?’ পানওয়ালা বললেন, ‘আমি মানুষরে ঠকাই না, মা। আগুন পানে গান পাউডার দেয়।’ অগত্যা আমি ২০ টাকা দিয়ে একটা মিষ্টি পান নিলাম, বিভিন্ন ধরণের মিষ্টি আর গন্ধযুক্ত মসলা, সাথে পানের ত্বকে তবক (সিলভার লিফ) জুড়ে দেওয়া। বাংলার নবাররা একসময় এই পুরান ঢাকাতেই দুপুরে হয়তো বিরিয়ানি খেয়ে একটা মিষ্টি পান খেয়ে আরামের ঘুম দিতো। আজ তারা নেই, তবে তাদের ধারণ করা মুঘলাই ঐতিহ্য ঠিকই রয়ে গিয়েছে।
ততক্ষণে প্রায় ১০.৩০ টা বেজে গেছে তাই আমরা বিসমিল্লাহ হোটেল নামে একটা হোটেলে ঢুকে কোনোমতে পরোটা আর বুটের ডাল ভুনা দিয়ে সকালের নাস্তা সেরে কারাগারের দিকে রওনা হলাম।

৪।
জেল এর কর্মকর্তা আশরাফ সাহেব নামে একজন আমাদের রিসিভ করতে আসবেন তাই আমরা কারাগারের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকলাম। এদিকে সবুজ গুগলে ম্যাপে পরবর্তী গন্তব্যগুলোর ঠিকানা বুঝে নিচ্ছে। আমি বললাম, ‘বাংলাদেশের টুরিজম নিয়ে এত তথ্য গুগলে আছে?’ সবুজ বিরক্ত হয়ে চোখমুখ কুঁচকে বললো, ‘বাংলাদেশকে কি তুই আফ্রিকার দেশ উগান্ডা পাইসোস?’ আমি অনেক কষ্টে হাসি চাপলাম। আমাদের কে একজন জেলের ভেতর ঢুকিয়ে একটা ঘরে বসিয়ে দিলো। গুগল করে জানলাম, এই কারাগার সেই ২২৮ বছরের পুরোনো! ব্রিটিশ আমলের আগে কারাগারের জায়গায় একটা মুঘল কেল্লা ছিলো, ১৯ শতকের প্রথম দিকে সেটা জেলখানায় পরিণত করা হয়। দেশের সবচাইতে পুরাতন জেলই হলো এই কেন্দ্রীয় কারাগার, অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিবৃন্দ এখানে বন্দী ছিলেন। বঙ্গবন্ধু এই জেলেই ৬ দফা দাবি পেশ করেন, ১৯৭৫ সালে ঐতিহাসিক জেল হত্যা এখানেই সংঘটিত হয়!সবুজ বললো, ‘যেই ঘরে বসে আছি এটা ২২৮ বছরের পুরাতন কল্পনা করতে পারিস?’ সুমাইয়া বললো, ‘খালি এই ঘরের এসিটাই ২২৮ বছরের পুরানো না!’ আমরা সবাই হো হো করে হেসে দিলাম। আশরাফ সাহেব এসে আমাদের সাথে পরিচিত হলেন। তিনি একজন জেলারের সাথে পরিচয় করে দিয়ে বললেন, ‘ওই তোমাদের সবাইকে জেল ঘুরিয়ে দেখাবে।’ আমি কোনোভাবেই ভ্রমণকাহিনীটা লেখার সময় সেই জেলারের নাম মনে কর‍তে পারছিনা, তাই উনাকে পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ বর্ণনা করার সময় ‘গাইড আংকেল’ হিসেবে সম্বোধন করাই ভালো হবে মনে হচ্ছে। পুরো জেলখানা অনেক বড় তাই আমরা নির্বাচিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ দেখার মতো জায়গা দেখবো।  জেলখানা শব্দটা মাথায় আসলে প্রথমেই যে দোযখের মতো কিছু একটার চিত্র ভেসে উঠে, জেলখানা মোটেই তেমন না। গাছপালা দিয়ে ভর্তি একটা খোলামেলা জায়গা। আমাদের ৩ জনের মনে হলো কাউকে খুন করে জেলখানায় বন্দী হয়ে যাই, এত সুন্দর জায়গা! বহু বছর আগে অবশ্য এই জায়গা এত খোলামেলা ছিলোনা, মানুষের ব্যস্ততায় তিলধারণের জায়গা পাওয়াই মুশকিল ছিলো।  গাইড আংকেল একটা বিল্ডিং দেখিয়ে বললেন, ‘এটা আমাদের বেকারি। যাদের সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডিত করা হতো তাদের অনেকেই এখানে বেকারির কাজ করতো। বন্দীদের বিভিন্ন কাজ শেখানো হতো যাতে তারা সমাজ থেকে এত বছর বিচ্ছিন্ন হয়ে জেল থেকে বের হয়ে সমাজে কোনোভাবে বেঁচে থাকার জন্য কিছু করতে পারে।’ বেকারির পাশে অনেক বিড়াল ঘুরাঘুরি করছে। এরা নাকি এখানেই আশ্রয় নিয়েছে। সবুজ বললো, ‘বিড়াল গুলার কোনো কাজ নাই? খাবারের লোভে এখানে ঘুরাঘুরি করে!’ গাইড আংকেল আমাদেরকে সংরক্ষিত একটা এলাকায় নিয়ে গেলেন, যেটার চারপাশ দেয়াল দিয়ে ঘেরা। ঢোকার আগে দেয়ালের পাশে অসংখ্য লোহার সিঁক দেওয়া একটা বিল্ডিং দেখিয়ে বললেন, ‘এখানেই ২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহী শয়তানদের আটকে রাখা হয়েছিলো।’ যেই সংরক্ষিত এলাকায় গেলাম সেখানেই বঙ্গবন্ধু বন্দী ছিলেন, এখানেই তিনি ছয় দফা দাবি পেশ করেন। সম্ভবত তাঁর ছয় দফা দাবির স্মৃতিচারণ করার জন্যই এখানে ছয়টা কালো স্তম্ভ বানানো হয়েছে, স্তম্ভের পিছে বঙ্গবন্ধুর মুড়াল আর সামনে মহান নেতার ভাস্কর্য। চারপাশে সুন্দর সব বৃক্ষ, একটা আলাদা রান্না ঘর আর থাকার জায়গা। হাস্নাহেনা ফুলের গন্ধ পেলাম, শুনলাম এই গাছটা বঙ্গবন্ধু নিজ হাতে লাগিয়েছেন। উনার হাতে রোপিত একটা সফেদা গাছও দেখলাম। এখানেই বঙ্গবন্ধুর থাকার জায়গায় একটা ছোট জাদুঘর বানানো হয়েছে, সেখানে তাঁর একসময়ের ব্যবহার্য খাট, চেয়ার, পাতিল ইত্যাদি রাখা হয়েছে। আমি আবেগাপ্লুত হয়ে সুমাইয়াকে বললাম, ‘কল্পনা কর‍তে পারো?’ দেখলাম ও নিজেও বিস্ময়ে অভিভূত। বঙ্গবন্ধুর বন্দীশালা থেকে বের হওয়ার সময় একটা বিল্ডিং দেখিয়ে গাইড আংকেল বললেন, ‘এটা আমার খুব পছন্দের জায়গা। তাহের উদ্দিন নামের একজন বন্দী গায়ক এখানে ছিলো। যা সুন্দর তার গলার সুর!’ এরপর গেলাম জেলহত্যা দিবসের ৪ নেতার কারাগার এ। খুব সম্ভবত কারাকক্ষেরভেতর থাকা অবস্থাতেই সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী, এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে কারাকক্ষের বাইরে থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়। কারাকক্ষের লোহার শিকের মধ্যে এখনো ৩ টা বুলেটবিদ্ধ চিহ্ন রয়ে গিয়েছে। হাঁটতে হাঁটতে আমরা একটা ফাঁসির মঞ্চের সামনে পৌঁছালাম। মাঝারি সাইজের একটা মঞ্চ, মঞ্চের মেঝে হলো কাঠের পাটাতন, ফাঁসি দেওয়ার সাথে সাথে পাটাতন টা খুলে যায় আর পাটাতনের নিচে প্রায় ৪ ফুট খালি জায়গায় মৃতদেহ পরে যায়। মঞ্চের নিচে সেই খালি জায়গার থেকে মৃতদেহ বের করার জন্য একটা দরজা। সুমাইয়া সেই দরজা খুলে ভেতরে উঁকি দিয়ে বললো, ‘এখানে কত আসামী ফাঁসি হুওয়ার পর পরে গেসে, কল্পনা করতে পারো?’ পুরো ফাঁসি দেওয়ার প্রক্রিয়াটা কল্পনা করে আমার মাথা ঘুরাতে থাকলো। গাইড আংকেল বিষয়টা বুঝিয়ে বললেন, ‘ফাঁসি দেওয়ার কথা চিন্তা করলে যে আমরা শ্বাসররোধে মারা যাওয়ার কথা ভাবি ফাঁসি কিন্তু মোটেই তা না। এটা মানুষের শরীরে ঘাড়ের থেকে শুরু হওয়া স্পাইন্যাল কর্ডের সাথে মস্তিষ্কের সংযোগ বিচ্ছিন করে দেওয়া। ফাঁসি দেওয়ার ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে সাধারণত মানুষ মারা যায়। এরপর মঞ্চের ভেতর থেকে মৃতদেহ বের করে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করলে সাথে সাথে সেখানেই পোস্টমার্টেম করা হয়। ফাঁসি দেওয়া আসলে অনেক সোজা, কিন্তু সেটার পরিবেশ তৈরি করাটা অনেক কঠিন। ফাঁসির সময় পুরো পরিবেশ একদম পিনপতন নীরব হয়ে যায়। একটা কাকও পর্যন্ত শব্দ করেনা।’ তিনি ফাঁসির বিভিন্ন কাহিনী বললেন, ধর্ষক মোসলেম, জঙ্গী বাংলা ভাই সিদ্দিকুর রহমানের কাহিনী। সিদ্দিকুর রহমানের শরীর ভারি ছিলো এজন্য ফাঁসি দেওয়ার সময় তার শরীর মঞ্চের নিচে পরলেও মাথা একদম উড়ে এসে ফাঁসির মঞ্চের সামনে পরে। আমার গায়ে একদম কাঁটা দিয়ে উঠলো। আমরা ফাঁসির মঞ্চে সাহস করে দাঁড়িয়ে ছবিও তুলে ফেললাম। শেষে জেলখানার বেকারির তৈরি বিস্কুট, সমুচা আর পেয়ারা দিয়ে হাল্কা নাস্তা করে সবাইকে ধন্যবাদ দিয়ে বের হয়ে গেলাম। কী অন্যরকম অভিজ্ঞতা!

৫।
এরপর রওনা হলাম লালবাগ কেল্লায়। মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের ৩য় পুত্র মুহম্মদ আজম ১৬৭৮ সালে কেল্লার কাজ শুরু করান। কেল্লার কাজ অসম্পূর্ণ থেকে গেলেও সুবেদার শায়েস্তা খানও এর কাজ সম্পূর্ণ করেন নাই। ১৬৮৪ সালে শায়েস্তা খানের কন্যা পরী বিবি লালবাগের কেল্লায় মারা গেলে তিনি জায়গাটা অশুভ ভেবে কাজ বন্ধ করে দেন। যখন শায়েস্তা খান ঢাকা ছেড়ে যান, কেল্লা তার জনপ্রিয়তা হারায়। এর কারণ তখন ঢাকার বদলে মুর্শিদাবাদকে রাজধানী করা হয়। উইকিপিডিয়ায় পড়া কেল্লার ইতিহাসের সারমর্ম এটাই। টিকিট কাটার লাইনে দাঁড়ালাম। এসএসসি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের টিকিট মাত্র ৫ টাকা, অন্যদের জন্য ২০ টাকা, সার্কভুক্ত দেশের পর্যটকদের জন্য ১০০ আর অন্যান্য দেশের জন্য ২০০ টাকা। কেল্লার ফটক দিয়ে ঢুকেই আমার আর সুমাইয়ার মুখ হা হয়ে গেল। কী সুন্দর হাল্কা লাল রঙের বিশাল কেল্লা! ইতিহাস বইয়ে পড়েছি, শায়েস্তা খানের সময় স্থাপত্যশিল্পের বেশ ভালো রকমের সুনাম ছিলো।আমার শায়েস্তা খানের উপর রাগ উঠলো কেন সে পুরা কাজটা শেষ করলোনা! এই কেল্লাতেই মনে হলো আয়নাবাজি সিনেমার একটা দৃশ্য শ্যুট করা হয়েছে, প্রথমবার আয়না সেই সাংবাদিকের সাথে বাদাম খেতে খেতে কথা বলেছিলো যেই দৃশ্যে। আমি আর সুমাইয়া যখন মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে আছি, সবুজ তখন বিড়বিড় করে বললো, ‘ক্ষ্যাত!’ আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘তুই কী বললি এটা?’ সবুজ বলল, ‘দেখিস না কেমন আনস্মার্ট মানুষ আসছে।’ আমি বললাম, ‘এত সুন্দর স্থাপত্য থাকতে তোর চোখে মানুষ পড়লো?’ সুমাইয়া বললো, ‘আরে বুঝোনা, ওর মনে হয় কোনো মেয়ে মনে ধরে নাই।’ আমি আবার হেসে দিলাম। সবুজ কিন্তু ঠিক কথাই বলেছে, কিছু মানুষ আসলেই আনস্মার্ট। এরকম ঐতিহাসিক একটা স্থাপত্যের দেয়ালে প্রেমিকপ্রেমিকার নাম লিখে রেখেছে। আমরা জেলখানা ঘুরে একটু ক্লান্ত ছিলাম, তাই এক জায়গায় বসে পড়লাম। কিছু বিদেশি পর্যটক চোখে পড়লো। সবুজের হঠাৎ শখ হলো বিদেশিদের সাথে কথা বলবে। আমি বললাম, ‘কথা বলার কী আছে? সাদা চামড়া দেখলেই আবেগাপ্লুত হওয়ার কিছু নাই। ওরাও মানুষ আমরাও মানুষ। এলিয়েন পাইসিস?’ সবুজ বললো, ‘কথা বলার নাই মানে? এরা আমাদের পর্যটন শিল্প কত উন্নত করতেসে জানিস? ২০০ টাকা দিয়ে টিকেট কিনসে?’ আমি বুঝলাম এই নাছোড়বান্দা কথা বলেই ছাড়বে। তাই গলায় ক্যামেরা নিয়ে ঘুরছে এমন একটা সুন্দর দেখতে শেতাঙ্গ ছেলের কাছে গেলাম। সবুজ রীতিমত তোতলানো শুরু করলো। ওর তোতলানো দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আগেই আমি তাড়াতাড়ি বললাম, ‘হ্যালো। ক্যান ইউ প্লিজ টেক আ পিকচার ওফ আস?’ বিদেশি পর্যটক বললো, ‘অফ কোর্স।’ আমি জিজ্ঞেস করে বুঝতে পারলাম সে একজন ইতালিয়ান। ছবি তুলে দেয়ার পর ধন্যবাদ দিয়ে আসার পর সবুজ বললো, ‘এটা তুই কী করলি? তাকে জিজ্ঞেস করা লাগবেনা বাংলাদেশ কেমন লাগলো? বাংলাদেশে আসার অন্য থ্যাংক্স দেওয়া উচিত ছিলোনা?’ আমি কিছু বললাম না, সিড়িতে বসে পড়লাম। আমরা বিভিন্ন বিষয়ে গল্প করা শুরু করলাম। হঠাৎ দেখলাম সেই ইতালিয়ান আমাদের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। আমার দিকে, নাকি সুমাইয়ার দিকে তাকিয়ে হাসলো এটা নিয়ে আমরা দুইজন রীতিমত তর্ক শুরু করলাম। সবুজ বললো, ‘মেয়েরা যে কী না! তোদের কারো দিকে তাকায় হাসে নাই, আমার দিকে তাকায়ই হাসছে।’ আমরাই এবার হেসে দিলাম। লালবাগ কেল্লা থেকে বের হয়ে কাছেই একটা দোকানে আমি আর সুমাইয়া জিরা পানি খেতে থাকলাম। সবুজ নামাজ পড়তে কেল্লার পাশের মসজিদে গেল। আমি আর সুমাইয়া দোকানে ওয়াইফাই পেয়ে দুইজনই ফোন বের করে ইন্টারনেটে বুদ হয়ে থাকলাম। এবার হেঁটে হেঁটে আমরা কলকাতা কাচ্চি ঘর খুঁজতে বের হলাম। জেলখানার কিছুটা সামনে দিয়ে একটা গলি চলে গিয়েছে, সেটা ধরে হাঁটতে হাঁটতেই কলকাতা কাচ্চি রেস্টুরেন্ট খুঁজে পেলাম। এই ছোটখাটো দোকানটাই সেই বিখ্যাত কলকাতা কাচ্চি! আমরা ১৮০ টাকা দিয়ে কাচ্চি আর ৩৫ টাকা দিয়ে বোরহানি অর্ডার দিলাম। কাচ্চিটা বেশ ভালোই, আলুটা পুরো মুখের ভেতর গলে যায়। টকমিষ্টিঝাল বোরহানিটা অসাধারণ, সব কিছুর ফ্লেভার একদম ব্যালেন্সড। আমরা খাওয়া শেষ নড়তেই পারলাম না, কিন্তু তাতে কী হবে। সামনে যে আরো গন্তব্য বাকি, আহসান মঞ্জিল আর সদরঘাট!

৬।
বাহাদুর শাহ পার্ক এর পাশ দিয়ে আহসান মঞ্জিলে এসে ঢুকলাম। ৩ টার সময় খুলবে, এখন বাজে ২.৩০ টা। মঞ্জিলের পাশে বিশাল টিকিট কেনার লাইন! আমরা তাই মঞ্জিলের ঠিক পাশে সদরঘাট দেখতে গেলাম। প্রচন্ড ঘিঞ্জি এলাকা, বৃষ্টিতে জায়গায় জায়গায় কাদা। পাশেই পাইকারি বাজার, ট্রাক ভর্তি সবজি। আর বুড়িগঙ্গা নদী ভর্তি লঞ্চ, নৌকা আর ময়লা। আমরা এখানে বেশিক্ষণ না থেকে আহসান মঞ্জিলে টিকিটের লাইনে দাঁড়ালাম। আমি শেষবার আহসান মঞ্জিলে ২০১৪ সালে এসেছিলাম, তখন এই স্থাপত্য আদি রঙ ধারণ করে ছিল। এখন পুরাটা প্রাসাদ নতুন করে গোলাপি রং করে ফেলেছে, তার ঐতিহ্যটাই নষ্ট হয়ে গিয়েছে। বিশাল এই প্রাসাদের বাইরেই জায়গায় জায়গায় প্যাঁচানো সিঁড়ি, বিশাল সব বারান্দা। চারপাশে সুন্দর সবুজ গাছপালা। পুরা মঞ্জিলের ভেতরটা একটা জাদুঘর। আগেকার নবাবদের ব্যবহার্য বাসনকোসন, দামি জিনিস, বিভিন্ন বই পত্র, বল রুম, ডাইনিং রুম, লিভিং রুম, ঢাল তলোয়ার, যুদ্ধের পোশাক, গ্রামোফোন, পিয়ানো এমন কত কিছু। আমাদের সবচেয়ে অবাক করলো নবাবদের এত রকম বিলাসিতা। আমাদের মনে হলো তথাকথিত আধুনিক সভ্যসমাজে জন্ম না হয়ে প্রাচীন যুগে কোনো নবাবের ঘরে জন্মালে পায়ের উপর পা তুলে জীবন কাটিয়ে দিলে মন্দ হতোনা। সব দেখা শেষে মঞ্জিলের বারান্দায় দূষিত বুড়িগঙ্গার হাওয়ায় বসে থাকলাম। বিশাল খোলামেলা একটা প্রাসাদ, সামনে বিশাল খোলামেলা নদী, এরকম জায়গায় থাকলে মনে হয় জীবনে আর কিছুই লাগতোনা। শেষে আমরা নাজিরাবাজারে অরিজিনাল বিউটি লাচ্ছি আর লেবুর সরবতে চুমুক দিয়ে প্রাণ জুড়িয়ে পুরান ঢাকার অদূরে নতুন সভ্য আধুনিক ঢাকার পথে রওনা দিলাম।বাসায় যেতে যেতে আমার কেন যেন মনে হলো, নগর সভ্যতার ক্রমবিকাশের মধ্য দিয়ে আরেকটা যাত্রা শুরু করছি!

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s